রাসায়নিক শক্তি
রাসায়নিক শক্তি জিনিসটা কী?
একদম সহজ কথায়, কোনো বস্তুর অণু-পরমাণুর ভেতরে যে শক্তি জমা থাকে, সেটাই রাসায়নিক শক্তি। আমরা যে খাবার খাই, সেই খাবার থেকে শক্তি পাই কীভাবে? কারণ খাবারের অণুর ভেতরে এই রাসায়নিক শক্তিটাই জমা থাকে। যখন আমাদের শরীর খাবারটাকে ভাঙে, তখন ওই শক্তিটা বেরিয়ে আসে আর আমরা দৌড়ানোর, খেলার, পড়ার শক্তি পাই।
চলো, এই শক্তির কয়েকটা রূপ দেখে নেই।
১. বন্ধন শক্তি (Bond Energy)
ভাবো তো, দুটো বন্ধু একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে আছে। ওদের আলাদা করতে হলে তোমাকে শক্তি দিয়ে ওদের হাত ছাড়াতে হবে, তাই না?
ঠিক তেমনি, অণুর ভেতরে পরমাণুগুলো একে অপরের সাথে একটা 'বন্ধন' বা 'বন্ড' দিয়ে যুক্ত থাকে (যেমন:
- বন্ধন ভাঙতে শক্তি লাগে: ওই হাত ছাড়ানোর মতো, পরমাণুর এই বন্ধন ভাঙতেও বাইরে থেকে শক্তি দিতে হয়।
- বন্ধন গড়লে শক্তি বের হয়: আবার যখন দুটো পরমাণু মিলে নতুন করে বন্ধন তৈরি করে, তখন ওদের ভেতর থেকে কিছু শক্তি বেরিয়ে যায়।
উদাহরণ: কাঠ পোড়ানোর সময় কী হয়? কাঠের অণুর ভেতরের কার্বন আর হাইড্রোজেনের বন্ধনগুলো ভেঙে যায় (এতে শক্তি লাগে), আর সেগুলো বাতাসের অক্সিজেনের সাথে নতুন বন্ধন তৈরি করে কার্বন ডাই অক্সাইড আর পানি বানায় (এতে শক্তি বের হয়)। এই যে শক্তিটা বের হয়, সেটাই আমরা আলো আর তাপ হিসেবে দেখতে পাই।
২. আন্তঃআণবিক শক্তি (Intermolecular Energy)
এইবার ভাবো একটা ক্লাসরুমের কথা।
- কঠিন অবস্থা: ক্লাসের সব ছাত্র বেঞ্চে একদম গায়ে গা লাগিয়ে বসে আছে। নড়াচড়ার উপায় নেই। এদের মধ্যে আকর্ষণ অনেক বেশি। বরফ ঠিক এইরকম। অণুগুলো খুব কাছাকাছি আর ওদের মধ্যে আকর্ষণ শক্তি অনেক বেশি।
- তরল অবস্থা: টিফিন টাইমে সবাই ক্লাসের ভেতর হাঁটাহাঁটি করছে, কিন্তু ক্লাসের বাইরে যাচ্ছে না। কাছাকাছি আছে, কিন্তু ছোটাছুটি করছে। পানি হলো এইরকম। অণুগুলো কাছাকাছি থাকলেও নড়াচড়া করতে পারে। আকর্ষণ শক্তি কঠিনের চেয়ে কম।
- গ্যাসীয় অবস্থা: ছুটির পর সবাই মাঠে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। একে অপরের থেকে অনেক দূরে। আকর্ষণ শক্তি প্রায় নেই বললেই চলে। পানির বাষ্প ঠিক এইরকম।
তাহলে কী বুঝলে? অণুগুলোর মধ্যে যে আকর্ষণ শক্তিটা কাজ করে, সেটাই আন্তঃআণবিক শক্তি।
এই শক্তি কঠিন > তরল > গ্যাসীয় ক্রমে কমতে থাকে।
৩. রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শক্তির রূপান্তর
এটা তো তোমরা সবাই জানো! শক্তিকে তৈরি বা ধ্বংস করা যায় না, শুধু এক রূপ থেকে অন্য রূপে নেওয়া যায়। একে বলে শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি।
রাসায়নিক বিক্রিয়াতেও ঠিক এটাই হয়।
উদাহরণ:
- মোমবাতি জ্বালানো: মোমের ভেতরে রাসায়নিক শক্তি জমা থাকে। যখন আমরা মোম জ্বালাই, সেই রাসায়নিক শক্তিটা তাপ শক্তি আর আলোক শক্তিতে পরিণত হয়।
- ব্যাটারি: গাড়ির ব্যাটারির ভেতরে থাকা রাসায়নিক পদার্থ বিক্রিয়া করে রাসায়নিক শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে পরিণত করে, আর সেই বিদ্যুতে গাড়ি চলে, লাইট জ্বলে।
৪. শক্তি মাপার একক
আমরা যেমন ওজন মাপি কেজিতে, তেমনি শক্তি মাপি ক্যালরি (Calorie) বা জুল (Joule) এককে।
- চিপসের প্যাকেটের পেছনে দেখেছ না লেখা থাকে এত ক্যালরি? ওটাই হলো খাবারের রাসায়নিক শক্তির পরিমাণ।
- মনে রাখবে, ১ ক্যালরি = ৪.১৮ জুল। (এটা কিন্তু পরীক্ষার জন্য খুব ইম্পর্ট্যান্ট, বিশেষ করে MCQ-এর জন্য!)
এক নজরে সব:
- রাসায়নিক শক্তি: অণুর ভেতরে জমা থাকা শক্তি।
- বন্ধন শক্তি: পরমাণুর হাত ধরাধরির শক্তি। ভাঙতে শক্তি লাগে, গড়তে শক্তি বের হয়।
- আন্তঃআণবিক শক্তি: অণুদের নিজেদের মধ্যে আকর্ষণ। কঠিনে সবচেয়ে বেশি, গ্যাসে সবচেয়ে কম।
- শক্তির রূপান্তর: শক্তি হারিয়ে যায় না, শুধু রূপ বদলায় (যেমন: রাসায়নিক শক্তি থেকে তাপ শক্তি)।